
মুজাহিদ হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবৈধ ভিটা মাটি কাটা যেন এখন আর গোপন কোনো অপরাধ নয়—বরং প্রশাসনের চোখের সামনেই দিনের আলোয় চলা এক ‘আইনবহির্ভূত শিল্প’। মথুরাপুর ইউনিয়নের কসবা মৌজায় সরকারি অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর ভিটা মাটি কেটে বিক্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নীরবতায় এই অপরাধ আজ রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
রাতের আঁধারে শুরু, সকাল ১০ টায় শেষ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কসবা গ্রামের আঃ সালাম,রুবেল, জুয়েল ও রাইহান নামে ব্যক্তি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে প্রতিদিন ভোররাত আনুমানিক ২টা থেকে সকাল ৯–১০টা পর্যন্ত অবৈধভাবে ভিটা মাটি কেটে ট্রাকযোগে বিভিন্ন ইটভাটা ও স্থাপনা প্রকল্পে সরবরাহ করে আসছেন। বছরের পর বছর ধরে এই কর্মকাণ্ড চললেও রহস্যজনকভাবে কখনোই কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হাতেনাতে প্রমাণ—তবুও বিচার নেই
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে ১৯ জানুয়ারি ২০২৬। সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদলগাছী মোঃ পলাশ উদ্দীন নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মাটি ভর্তি একটি কাকড়া ট্রাক আটক করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন—ট্রাকটি তখন অবৈধভাবে কাটা ভিটা মাটি বহন করছিল।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নের বিস্ফোরণ।
অপরাধ ধরা পড়ার পরও কোনো মোবাইল কোর্ট নয়, জরিমানা নয়, মামলা নয়—বরং কিছুক্ষণ পর অজ্ঞাত কারণে ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়া হয়। এটি কি আইনের ব্যর্থতা, নাকি প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব?
ভুমি আইন কি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?
ভূমি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রচলিত আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া ভিটা বা কৃষি জমির মাটি কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। সেখানে অপরাধের প্রমাণ সরাসরি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগ না হওয়া মানে—আইনকে কার্যত প্রকাশ্যেই “বৃদ্ধাঙ্গুলি” দেখানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন নজির অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—“ধরা পড়লেও শাস্তি নেই”। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ ও কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা ভয়াবহভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
প্রশাসনের নীরবতা—অপরাধের সবচেয়ে বড় শক্তি?
ঘটনাটি জানাজানি হতেই কসবা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন—যদি সহকারী কমিশনারের উপস্থিতিতেই অপরাধের বিচার না হয়, তবে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের দায় আসলে কার?
এই বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ পলাশ উদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর এই নীরবতাও নতুন করে সন্দেহ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, বদলগাছীতে অবৈধ মাটি কাটার পেছনে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যাদের ছত্রছায়া না থাকলে দিনের পর দিন এভাবে মাটি লুট সম্ভব নয়। তারা অবিলম্বে—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত
দায়িত্বে অবহেলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
অবৈধ মাটি কাটার সিন্ডিকেট চিহ্নিত ও ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্ন থেকেই যায় আইনের চোখে সবাই সমান—নাকি প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা নিয়ম?
বদলগাছীর কসবা মৌজার এই ঘটনা আজ শুধু একটি ট্রাক ছেড়ে দেওয়ার গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার এক নগ্ন চিত্র, যার জবাব এখন প্রশাসনকেই দিতে হবে।